Wednesday, August 24, 2016

যখন উচ্চ পদে স্ত্রী

আয়েশার (ছদ্মনাম) মনে আজ খুবই আনন্দ। সরকারি ব্যাংকের, চাকরি জীবনে তার এই দিনটি চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দুপুরের দিকে সে জানতে পারল যে অফিসে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে তাকেই নির্বাচিত করা হয়েছে। তার সাথে পদোন্নতির তালিকায় আরও তিনজন সহকর্মীও ছিল। শেষ পর্যন্ত তার রিপোর্ট ভাল থাকায় তাকেই নির্বাচিত করা হয়েছে। এটা আয়েশার জন্য বিরাট এক পাওয়া। একজন নারী হিসেবে পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে সবসময়ই নানা বিরূপ মন্তব্য তাকে সহ্য করতে হয়েছে। তার এই খুশির কথা কাকে প্রথম বলবে, আর এই আনন্দ কার সাথে ভাগাভাগি করবে, তা চিন্তা করতে গিয়ে বাড়ির এক প্রতিকূল চিত্র তার চোখের সামনে ফুটে উঠল। নিজ কর্মক্ষেত্রের এই সাফল্যের কথা স্বাভাবিকভাবেই সর্বপ্রথম নিজের জীবনসঙ্গীকেই বলার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু নিজের বাড়িতে তার এই পদোন্নতি যেন এক অভিশাপ। তার স্বামী স্কুলশিক্ষক। 

আয়েশা জুনিয়র অফিসার হিসেবে ব্যাংকে প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে তার পদোন্নতি হতে থাকে আর সাথে সাথে বাড়তে থাকে পারিবারিক অশান্তি। শেষে সংসার টিকিয়ে রাখতে নিজের পদোন্নতি, বেতন সব তথ্যই সে তার স্বামীর কাছ থেকে লুকোনো শুরু করে। তার এই সাফল্য তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধে পরিণত হয়। সে তার কাজের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে স্বামীর কাছ থেকে কখনো অনুপ্রেরণা তো পায়ইনি, বরং সবসময়ই শুনেছে তিরস্কার। তাই সেই কষ্টকে মেনে নিয়ে পদোন্নতির কথা ভুলে গিয়ে, বাড়ি এসে স্বামীর সেবায় মগ্ন হয় আয়েশা। এ চিত্র শুধু আয়েশার জন্যই নয়, সমাজের বেশিরভাগ নারীর জন্যই প্রযোজ্য। স্বামীর চেয়ে স্ত্রী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হলে স্বামীর পক্ষে তা মেনে নেয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। স্ত্রীর চাকরি জীবনে সাফল্যের জন্য তাকেই দোষী করে তোলা হয়। একজন স্বামীর কর্মক্ষেত্রের সাফল্যকে স্ত্রী তার নিজের সাফল্য হিসেবে মেনে নেয়। প্রতি মুহূর্তে স্বামীর সেবা-শুশ্রূষা করে তাকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে থাকে যেন সে তার চাকরি ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারে। সেখানে একই স্ত্রী যখন চাকরি ক্ষেত্রে নিজের সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে থাকে তখন প্রতি মুহূর্তে তাকে বাধার মুখোমুখি হতে হয়। 

স্বামীর সেবায় যথেষ্ট মনোনিবেশ করতে না পারার কারণে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রীর সাফল্যকে নিজের জন্য গৌরবের হিসেবে মেনে নিতে পারে না। সামাজিকভাবেও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মুখোমুখি হতে হয় একজন স্বামীকে, যদি তার স্ত্রী উচ্চপদস্থ ও বেশি আয়ের কর্মকর্তা হয়। সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন খুবই জরুরি। একজন স্বামীর সাফল্যের পেছনে যদি অনুপ্রেরণা জোগায় তার স্ত্রী, তবে স্ত্রীর সাফল্যের পেছনে কেন তার স্বামী অনুপ্রেরণা হতে পারে না? স্ত্রী স্বামীর চেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হলে, কেন তা স্বামীর ব্যক্তিত্বে আঘাত হানে ও পারস্পরিক রেষারেষির কারণে পারিবারিক কোন্দল সৃষ্টি করে। বহুকাল ধরে সামাজিকভাবে চলে আসা ধ্যান-ধারণার প্রভাবেই সৃষ্টি হয় এই সংঘাতের। তাই সামাজিকভাবে প্রচলিত এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। স্বামীর অগ্রযাত্রায় স্ত্রীকে যেমন বন্ধু হিসেবে সাহায্য করতে হবে, তেমনি স্বামীকেও তার স্ত্রীর অগ্রযাত্রার পথে সহযোগী হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে।

কখনো কখনো দেখা যায় স্বামী তার চাকরি ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে বা হাল ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু পাশাপাশি স্ত্রী নিজ গুণে নিজ ক্ষেত্রে এগিয়ে চলেছে। সেক্ষেত্রে স্ত্রীর উপর শুরু হয় স্বামীর ভিন্ন ধরনের নিপীড়ন। এমনই এক নারী তানজিনা (ছদ্মনাম)। তার স্বামী এনজিওকর্মী। নিজ চাকরি ক্ষেত্রে এগুতে না পেরে হতাশ। তার স্ত্রী তানজিনা বেসরকারি ব্যাংককর্মী। প্রতিদিন বাড়ি গেলেই তার ওপর শুরু হয় নিপীড়ন। কেন সে ব্যাংক ঋণ নিচ্ছে না? কেন সে তার স্বামীর নামে ক্রেডিট কার্ড, ভিসা কার্ড করছে না। অতিরিক্ত চাওয়ার মধ্য দিয়ে নিপীড়নের এই ধারাও তার জীবনের প্রতি, তার কাজের প্রতি বিতৃষ্ণার জন্ম দিচ্ছে। এ ধরনের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় চাকরি ছেড়ে দেয়া। এভাবে অতিরিক্ত চাওয়া-পাওয়ার কারণে সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। বর্তমানে অবস্থার কিছু পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। কিন্তু তারপরও নারী-পুরুষের সামাজিক বৈষম্যের কারণে শেষ পর্যন্ত নারীকেই সবকিছু ছেড়ে আসতে হয়। স্ত্রীর প্রতি রাগ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে স্ত্রীর কাজের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবার পথে বাধা সৃষ্টি করা উচিত নয়। বরং স্বামীকে তার স্ত্রীর পাশে সহযোদ্ধা হিসেবে দাঁড়াতে হবে এবং স্ত্রীর জয়কে স্বামীর পক্ষ থেকে নিজের জয় হিসেবে মেনে নিতে হবে। তবেই উচ্চপদস্থ স্ত্রীর কাছে তার স্বামীই হবে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। দু'জনের জয়ে নিজেরা হবে সুখি, পাশাপাশি তাদের সংসার জীবনও হবে সুখের।

No comments:

Post a Comment